আইনজীবীর ভুলে মক্কেলের ভোগান্তি কাম্য নয় : হাইকোর্টের রায়
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৯-১০-২০২৬ ১২:০৪:৫৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-১০-২০২৬ ১২:০৪:৫৫ অপরাহ্ন
আইনজীবীর ভুলের জন্য মক্কেলকে (বিচার প্রার্থী) ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া উচিত নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ে আদালত বলেছেন, মামলার আরজি প্রস্তুত করার সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ভুল করেছিলেন। এতে মক্কেলের (বাদী) কোনো ভূমিকা ছিল না। সুতরাং, মক্কেলের (বাদী) নিযুক্ত আইনজীবীর করা এই ভুল বা ত্রুটির কারণে মক্কেলের (বাদী) ভোগান্তি হওয়া উচিত নয়।
মোহাম্মদ আসিফ বনাম রাষ্ট্র মামলায় এমন যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
জমির মালিকানা সংক্রান্ত এক ফাস্ট আপিল মামলায় অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য অধস্তন আদালতে ফেরত পাঠিয়ে বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর এই রায় দিয়েছেন।
৮ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার (২৮ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বিলকিস নাসিমা রহমান, মো. আবদুস সালাম ও মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন সিদ্দিক।
মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান।
মামলার পটভূমি ও বিচার্য বিষয়বস্তু
প্রকাশিত রায় ও মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, হাইকোর্টে আপিলকারী তথা বাদী মোহাম্মদ আসিফ বিরোধপূর্ণ ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ জমির ওপর স্বত্ব ঘোষণা চেয়ে উপরোক্ত মামলাটি দায়ের করেছিলেন। বাদীর দাবি অনুযায়ী, উক্ত জমিটি প্রসন্ন কুমার বসু ও অন্যান্যদের ছিল এবং সি.এস. খতিয়ান নম্বর ২৭১৫-এ তা সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছিল। সি.এস. রেকর্ডভুক্ত স্বত্বাধিকারী গণ ১৯৫২ সালের ১৮ জুন, ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ আগস্ট তারিখের রেজিস্ট্রিকৃত পাট্টা দলিলের (নির্দিষ্ট শর্তে জমি ভোগ দখলের অধিকার প্রদান) মাধ্যমে উক্ত জমি কাজী আবু সাঈদ বরাবরে হস্তান্তর করেন।
পরবর্তীতে তিনি ১৯০৪ সালের ১৩ জানুয়ারি রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের (জমি বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতার অনুকূলে হস্তান্তর করা) মাধ্যমে হাজী সালাহউদ্দিন ও খলিল মিয়া বরাবরে তা হস্তান্তর করেন এবং খলিল মিয়া তার অংশ ১৯০৪ সালের ৬ অক্টোবর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে হাজী সালাহউদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে, আর.এস. খতিয়ানে সর্বমোট ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ জমির পরিবর্তে কেবল ৫৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ জমি ভুলবশত কাজী সালাহউদ্দিনের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়।
পরবর্তীতে সালাহউদ্দিন ১৯৮৯ সালের ৩১ মে রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে বাদী মোহাম্মদ আসিফের বরাবরে ৬৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন এবং মোহাম্মদ আসিফ সেখানে একটি কারখানা স্থাপন করে উক্ত জমি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু উক্ত জমিটি সিটি সার্ভে খতিয়ান নম্বর-১ এ বিবাদীদের নামে ভুলভাবে রেকর্ডভুক্ত হয়। এরপর উক্ত ভুল রেকর্ডের ভিত্তিতে স্থানীয় তহশিলদার মোহাম্মদ আসিফের কাছ থেকে খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেন।
পরে সিটি সার্ভের খতিয়ান ভুল ও অবৈধ ঘোষণা চেয়ে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন মোহাম্মদ আসিফ। তবে, ওই মামলার আরজিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী আর.এস. খতিয়ানে ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ জমির পরিবর্তে মাত্র ৫৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ জমি কাজী সালাহউদ্দিনের নামে ভুলবশত রেকর্ডভুক্ত হওয়া এবং উক্ত জমিটি সিটি সার্ভে খতিয়ান নম্বর-১ এ বিবাদীদের নামে ভুলভাবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করেননি। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো আইনজীবীর দৃষ্টি থেকে এড়িয়ে যাওয়ায় মোহাম্মদ আসিফ এ মামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালের ১৫ জুন ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে উক্ত মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। আদালত বাদীর আবেদন খারিজ করে রায় ও ডিক্রি দেন। এরপর বিচারিক আদালতের উক্ত রায় ও ডিক্রির দ্বারা সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে মোহাম্মদ আসিফ ২০১৮ সালে হাইকোর্টে ফাস্ট আপিল দায়ের করেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, আপিলকারীর আইনজীবীর উপস্থাপিত বক্তব্য এবং সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, মামলার আরজি প্রস্তুত করার সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ভুল করেছিলেন। এতে মামলার বাদীর কোনো ভূমিকা ছিল না। সুতরাং, বাদীর নিযুক্ত আইনজীবীর করা এই ভুল বা ত্রুটির কারণে বাদীকে (মক্কেল) ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়।
রায়ে হাইকোর্ট আরও বলেন, মামলার সার্বিক তথ্য-উপাত্ত এবং রেকর্ডের নথিপত্র বিবেচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, উভয় পক্ষকে তাদের নিজ নিজ আরজি সংশোধন করার এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে যদি মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠানো হয়, তবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
রেকর্ডের নথিপত্র পর্যালোচনায় আমরা এই ফাস্ট আপিলে পর্যাপ্ত সারবত্তা খুঁজে পেয়েছি, যা মঞ্জুরযোগ্য। ফলশ্রুতিতে, ফাস্ট আপিলটি মঞ্জুর করা হলো।
ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ কর্তৃক মামলার প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হলো। এবং উভয় পক্ষকে তাদের নিজ নিজ আরজি সংশোধন করার এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে, মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠানো হলো। পাশাপাশি, এই আদেশের অনুলিপি প্রাপ্তির তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে অতি দ্রুত মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন করার জন্য যুগ্ম জেলা জজ আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হলো।
এই মামলার নথিপত্র অবিলম্বে অধস্তন আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স